আমার স্কুল জীবন কেটেছে এক মফঃস্বলে।মুর্শিদাবাদের সদর থেকে মাইল বিশ দূরে গঙ্গার ধারে সেই অখ্যাত ছোট্ট শহর জিয়াগঞ্জ।বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক।তাঁর কর্মসূত্রেই জিয়াগঞ্জে বসবাস।সে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগেকার কথা।নব্বই-র খোকারা অধিকাংশই সেই সময় মায়ের কোলে আড়িমুড়ি কাটছে।টেলিফোন তখনো আমাদের শহরে পৌঁছয়নি।গুটি কতক বড়োলোক বাড়িতে সাদা কালো টেলিভিশন এসেছে সবে।রাস্তায় মার্কারি বাল্বের মিটমিটে আলো আর তার উপর ঘন ঘন লোড শেডিং।এক কথায় ছোট মফঃস্বলের দৈনন্দিন জীবন তখনো অনেক নিস্তরঙ্গ ও নিরুত্তাপ - মানুষে মানুষে দূরত্বও ঢের বেশি।
আমি তখন বারো ক্লাসে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ি।আমার অন্তরঙ্গ সঙ্গী - সুব্রত আর পরিতোষ।তাদের বসত জিয়াগঞ্জ থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরে এক গ্রামে।দশ ক্লাস পর্যন্ত তারা গ্রামের স্কুলেই পড়তো।তারপর সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় শহরের স্কুলে এসে ভর্তি হয়।আমার অবশ্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই একই স্কুল।স্কুল ভর্তি আটপৌরে ছাত্রদের ভিড়ে আমি ছিলাম ফার্স্ট বয়।তাই এগারো ক্লাসে যখন পাশের গ্রামের দুজন নামজাদা পড়ুয়া ছেলে এসে ভর্তি হলো আমার স্কুলে,তখন স্বাভাবিক ভাবেই তাদের সাথে বন্ধুত্ব জমতে দেরি হলো না ।তারপর আবার তিনজনেই একই কেমিস্ট্রি টিউশনে ভর্তি হলাম।শহরে কেমিস্ট্রির ভালো গৃহ শিক্ষক না থাকায় গঙ্গা পেরিয়ে আজিমগঞ্জ শহরে পড়তে যেতাম।বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক গঙ্গার ঘাট - তারপর নদী পেরিয়ে আধ কিলোমিটার গেলেই স্যারের বাড়ি।আমি যে রাস্তায় গঙ্গার ঘাটে যেতাম ,সুব্রত আর পরিতোষের ঘাটে পৌঁছাবার রাস্তা ছিল আলাদা - গঙ্গার পার বরাবর।আমরা প্রতি বুধ আর শুক্রবারে গঙ্গার ঘাটে জড়ো হয়ে বাকিটা রাস্তা একসাথে যেতাম।এগারো ক্লাসটা এভাবে ভালোই চললো বটে কিন্তু তিন মূর্তির বন্ধুত্বে গ্রহণ লাগলো বারো ক্লাসের গোড়াতেই - তার কারণ একটু বাদেই জানাচ্ছি।
যে দিনের কথা সেটা শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি ভেজা এক বুধবার।টানা তিনদিন ধরে মুষল ধারে নিম্নচাপের বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া।রাস্তাঘাট জল কাদায় থৈ থৈ।নদী কানাই কানাই ভর্তি হয়ে ছাপিয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে।স্বাভিকভাবেই স্কুলে যায়নি সেদিন।অবশ্য অমন দুর্যোগের মধ্যেও টিউশন না যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।তার কারণ অবশ্য কৈশোরের প্রথম প্রেম।মোবাইল ফোন,ফেসবুক বা অর্কুটের যুগ সেটা নয় - টিউশন,ফাঁকা ক্লাসরুম বা নির্জন গলিতে মুখো মুখি হয়েই তখন কপোত কপোতীদের প্রেম করতে হত।প্রণয়িণীর নাম উহ্য রাখছি। তবে এটা জানানো উচিত যে সে বারো ক্লাসের শুরুতেই টিউশন এ ভর্তি হয়। ভালো ছেলে হিসাবে তল্লাটে আমার বেশ নাম ডাক ছিল।তাই অচিরেই নবাগতা কুহকিনীর মন জয় করলাম।পরিতোষেরও যে মেয়েটির প্রতি দুর্বলতা ছিল সেটা বুঝেছিলাম। তবে সে মুখচোরা - সাধাসিধে গ্রাম্য ছেলে। প্রেম করা তার কম্ম নয়।কিন্তু একদিন যখন প্রেমিকার লেখা চিঠি আর উপহারের Rotomac পেনটা দুই বন্ধুর সামনে যুদ্ধজয়ী বীরের মতো বের করে বসলাম,সেদিন থেকেই আমার আর পরিতোষের স্বাভাবিক মেলামেশা আর কথাবার্তা বন্ধ হল। সুব্রত না থাকলে হয়ত মুখ দেখাদেখিই বন্ধ হয়ে যেত।
যাইহোক , সেদিনও ঝড় বাদলা মাথায় নিয়ে কারুর কথা না শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।ঘাটে এসে দেখি সুব্রত নেই - একা পরিতোষ দাঁড়িয়ে।জিজ্ঞাসা করায় সে বললো যে গ্রামের ক্লাব ফুটবলের ফাইনালে খেলবে বলে সুব্রত আসেনি।অতঃপর দুজনে ঘাট পার করে আধ ঘন্টা সাইকেল ঠেঙিয়ে সন্ধে সাতটায় যখন টিউশন পৌঁছলাম তখন আপাদমস্তক ভিজে গেছি।বলাই বাহুল্য যে এই দীর্ঘ পথে দু জনের মধ্যে আর কোনোই কথা হয়নি।
সেদিন স্যার তিন ঘন্টার বদলে দুই ঘন্টা পড়িয়েই ছুটি দিলেন।সকলেই দূর দূরান্ত থেকে পড়তে আসে - অতঃএব এই দুর্যোগে বাড়ি ফেরা অসুবিধা।আমার অবশ্য তাতে ভালোই হলো।আমি বেরিয়ে পাশের নির্জন গলিতে প্রেমচারিতা শুরু করলাম।পরিতোষ দেখলাম সাইকেল নিয়ে বেরোবার সময় একবার অন্ধকার গলির মুখে দাঁড়ালো। হয়তো ভেবেছিল এই দুর্যোগের দিনে একসাথে যাবে।আমার অবশ্য সে সদিচ্ছা ছিল না।সুব্রত থাকলে তাও বা কথা ছিল। শুধুমাত্র বাদলার ভয়ে পরিতোষের সঙ্গ নিতে পৌরুষে বাঁধলো।সেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেল।সেদিনের প্রেম পর্বটা একটু বেশি সময় ধরেই চলল।ঘাটে যখন পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে দশটা - আবার বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে।
ঘাটে পৌঁছেই বুঝলাম যে রাত করে ভালো করিনি।এই কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতেই গঙ্গা যেন আরো ফুলে ফেঁপে উঠেছে।রাস্তা ঘাট এতটাই পিছল যে একটু অন্যমনস্ক হলেই সাইকেল নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়।ভাগ্য ভালো যে কোনো মতে শেষ নৌকাটা পেয়ে গেলাম - যাত্রী বলতে শুধুই আমি আর মাঝি।নৌকো যখন মাঝ গঙ্গায় তখন আরেক বিপত্তি।দুই পাড়েই এক সাথে লোড শেডিং হয়ে গেলো।চারিদিকে তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার - যেন আদিম পৃথিবীর কোনো এক ভরা গাঙে ভেসে চলেছি পৃথিবীর প্রাচীনতম দুই মানুষ - চরাচরে যাদের আর কোনো সঙ্গী নেই।গঙ্গার ঢেউয়ের ছলাৎ ছল আর পাড় ভাঙার হুড়মুড় শব্দে তখন বেশ ভয় করতে লেগেছে।ভরা গঙ্গা ঠেলে নৌকা যখন ঘাটে লাগলো তখন আমি ভিরমি খেলাম।আগেই বলেছি যে গঙ্গার ঘাট থেকে আমার বাড়ি প্রায় মাইল দুয়েক।এর মধ্যে প্রথম এক মাইল এরও বেশি রাস্তা শহরের চৌহুদ্দির বাইরে - খাল-বিল আর বন বাদাড়ের মধ্যে দিয়ে।এইটুকু রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ - খানা খন্দে ভরা।রাস্তার ধারে বড় বড় গাছ আর বাঁশ বন।লোকবসতি নেই কোনো।এই বাদলা রাতে সহযাত্রী পাবার আসা করাও ভুল।কারেন্ট থাকলে তাও মার্কারি ল্যাম্পের মিটমিটে আলোয় কোনোমতে আন্দাজ করা যায়।আজ চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।কিছুই ঠাহর করার জো নেই।ফেরি ঘাটের চড়াই টা উঠে আর যেন কিছুই চেনা যায় না - রাস্তাঘাট,খাল বিল সব যেন অন্ধকারে গ্রাস করেছে।এইবার আমার সুব্রত আর পরিতোষের কথা খুব করে মনে পড়ে গেলো।এর আগে অনেক বাদলা দিনেই আমাকে বাড়ি অব্দি পৌঁছে ঘুরপথে গ্রামে ফিরেছে তারা।আজ বোধহয় পরিতোষের সঙ্গ নিলেই ভালো করতাম !
নৌকটা ঘাট ছেড়ে চলে গেল।ঘাটের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে কি কর্তব্য ঠিক করছি এমন সময় যেন ইষ্ট দেবতা টর্চ মেরে পথ দেখালেন। বিশাল শব্দ করে বাজ পড়ার সাথে সাথে চারিদিক মুহূর্তের জন্য দিনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল।রাস্তার অবস্থানটা এক্স রে-র মনে ছেপে গিয়েছিল। দেরি না করে সেইদিকে সাইকেল ছুটিয়ে দিলাম।একে অন্ধকার তারপর চশমা তে জল পড়ে আরেক বিপত্তি।বিদ্যুতের আলোতে পথ ঠাহর করে এগোতে লাগলাম কোনোক্রমে।দমকা হাওয়ায় গায়ে বৃষ্টির ঠান্ডা জল বিঁধছে বরফের মত।।শহরের অনেক লোকের কাছেই এই রাস্তায় ভুতুড়ে কান্ড নিয়ে কানাঘুসো শুনেছি - অদ্ভুতদর্শন বেড়াল কুকুর ঘুরে বেড়ায় অমাবস্যা রাত্রে।এই কুক্ষনে সেই সব আজগুবি কথা মনে পড়তে লাগলো বেশি করে।চারিদিকে ব্যাঙ,ঝিঁঝিঁ পোকা আর শেয়ালের শব্দে গা ছমছম করছে।মিনিট পনেরো সাইকেল চালিয়েছি বটে তবে পথ বেশিদূর আসতে পারিনি। রাস্তার খানা খন্দে সাইকেলের চাকা হোঁচট খাচ্ছে।এই পড়ি সেই পড়ি অবস্থা।পড়তে দেরিও লাগলো না।দেখতে না পেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লাম।চশমাটা ছিটকে গিয়ে পড়ল পাশের জঙ্গলে।ওটা ছাড়া আমি আবার কানা।তার উপর হাত পায়ে তীব্র ব্যাথা - ঢোক গিলে বুঝলাম মুখটা ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে।এক অজানা ভয়ে শরীর তখন অবশ হয়ে আসছে।যেন বেরোবার কোনো উপায় নেই এই সর্বব্যাপী অন্ধকার ভেদ করে।বেশ কিছু সময় কেটে গেল মাটিতে পড়ে থেকে।আন্দাজে মিনিট পনেরো কুড়ি হবে - তবে তখন সেটাই কয়েক হাজার বছরের সমান।
নিজেকে প্রায় ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছি , এমন সময় হঠাৎ মনে হলো সাইকেলের বেলের আওয়াজ পেলাম ।অস্ফুট একটা শব্দ - কিড়িং কিড়িং । তারপর যেন কেউ খাটো গলায় বলল - 'ওঠ ভাই।ভয় নেই।'।আওয়াজটা তো চেনা লাগে বেশ - হ্যাঁ,পরিতোষেরই তো গলা।কিন্তু ও এখনো এখানে কি করছে ? বেশি ভাবার সময় তখন ছিল না যদিও ।এই নরক থেকে বেরোবার এটাই যেন শেষ উপায়।অন্ধকার হাতড়ে সাইকেলটা তুলে নিয়ে সেই অজ্ঞাত সাইকেল চালকের পিছু নিলাম।চশমা নেই তাই সবকিছু আবছা দেখছি।তবে শরীরের কাঠামো আর হেলদোলে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে আর সন্দেহ নেই যে এ পরিতোষই বটে।কিন্তু কি অদ্ভুত তার সাইকেলের চাল।এই মনে হচ্ছে তাকে ধরে ফেলব-অথচ পর মুহূর্তেই যেন ছবির মতো দূরে চলে যাচ্ছে।ডাকবার মতো আওয়াজ তখন গলা দিয়ে বেরোচ্ছিল না।আমি প্রায় মন্ত্রমুদ্ধের মতো তার পিছু পিছু চললাম।প্রায় পনেরো মিনিট এভাবেই চলল।শহরের দোর গোড়ায় এসে তাকে আর দেখতে পেলাম না।কপ্পুরের মতো যেন উবে গেলো কোথায় ?ব্যাপারটা অদ্ভূত লাগলো একটু। কিছুক্ষন দাঁড়িয়েও তার কোনো পাত্তা পেলাম না।ভাবলাম রাত হয়েছে তাই তাড়াতাড়ি সাইকেল ছুটিয়েছে - এখান থেকে ঘুরপথে ওর বাড়ি অনেকদূর।আমিও হন্তদন্ত সাইকেল চালিয়ে শহরের অন্ধকার ভেদ করে বাড়িতে ঢুকলাম।বাড়ি শুদ্ধ লোক যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো।বকাবকি অবশ্য ভালোই জুটেছিল কপালে।বিছানায় শুয়ে শুয়ে একবার সাধা সিধে গ্রাম্য পরিতোষের মুখটা মনে পড়ল - ঠিক করলাম পরের দিনই দেখা করে ভালো করে কথা বলবো।
সংবাদ তখনো ছড়াতো মানুষের মুখে মুখে।তাই অবাক করা খবরটা পেলাম পরের দিন সকালে ফিজিক্স টিউশনে গিয়ে তবেই - পরিতোষ নাকি গতকাল থেকে নিখোঁজ।কেমিস্ট্রি পড়ে আর বাড়িই ফেরেনি সে।আকাশ থেকে পড়লাম।সঙ্গে সঙ্গে দৌড়লাম ওদের গ্রামের দিকে।বাড়ি চিনতাম না-তবে রাস্তাতেই সুব্রত কে দেখলাম।উদ্ভ্রান্ত হয়ে শহরের দিকেই আসছিল।সব কথা বললাম ওকে।তারপর ওর সাথেই ছুটলাম পরিতোষ কে খুঁজতে।
পরিতোষকে পাওয়া গেলো সেদিন সন্ধে নাগাদ - গঙ্গার ধার বরাবর যে রাস্তায় সে যাতায়াত করত তারই ধারে এক নালায় ওর লাশটা ভেসে উঠেছিল।ফুলে ফেঁপে ঢোল হওয়া বিকৃত একটা মৃতদেহ।আমি অবশ্য সেটা নিজের চোখে দেখার সাহস করতে পারিনি।বন্ধুর সাথে শেষ বারের মত কথা বলতে পারলাম না - অস্ফূটেই চোখের জল ফেললাম।কাল হয়তো একসাথে ফিরলে আজ ছেলেটা বেঁচে থাকত - এখনো আমার সেজন্য নিজেকে দোষী মনে হয়।
লোক মুখে শোনা গেল যে আগের দিন সন্ধে থেকেই নাকি গঙ্গার ধারের বাঁধ ভেঙে নালা ছাপিয়ে রাস্তা দিয়ে খরস্রোত বইছিল।সবাই অনুমান করল যে ওই স্রোতেই দেখতে না পেয়ে বেচারা তলিয়ে গেছে রাত বিরেতে।তাই যদি হয় - তবে সে তো কাল শহরের রাস্তায় আসেইনি।তাহলে আমাকে কাল অভয় দিয়ে পথ দেখিয়েছিল কে ?
No comments:
Post a Comment