Tuesday, February 16, 2021

নদীয়া জেলার উত্তর পূর্বে জলঙ্গী নদীর ধারে এক প্রত্যন্ত প্রাচীন শহর তেহট্ট।নিতান্তই ছোট শহর - খুব জোর দুই হাজার লোকের বাস।শহরের শেষ প্রান্তে খান দুশো পূর্ব বঙ্গীয় পরিবার থাকে।সবকটাই ছা পোষা মধ্যবিত্ত সংসার।এলাকাটার একটা আদি নাম ছিল বটে তবে তা আজ বিস্মৃতপ্রায়।তেহট্টের দেশীয় বাসিন্দারা ঠাট্টা করে সে এলাকার নাম দিয়েছিল বাঙাল কলোনী।এখন সেই নামই থেকে শুরু করে সরকারি নথি সর্বত্র  


বছর দশেক আগের কথা।শীতকালের এক অলস নিস্তরঙ্গ সন্ধ্যায় বাঙাল কলোনীতে ফণিভূষণ ঘোষের বাড়ি থেকে 'বল হরি হরি বোল' রব উঠল। ফণি বাবুর স্ত্রী ঊমা ঘোষ দীর্ঘ এক বছর ক্ষয় রোগে ভুগে মারা গেলেন।মৃতদেহ যখন বাড়ির দাওয়ায় এনে রাখা হল তখন পাড়া প্রতিবেশীদের ঢল নামল।ঊমা দেবী মিশুকে মহিলা ছিলেন এবং পাড়ায় সবার সাথেই সদ্ভাব ছিল।তাই মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যুতে সকলেই খুব হা হুতাশ করল।ফণি বাবুর নিজের এবং শ্বশুর বাড়ির পক্ষের লোকজন বেশীর ভাগই কাছাকাছি থাকত।তারাও এসে জড়ো হয়েছে।সমবেত মহিলা মহলের মধ্যে থেকে সংক্ষিপ্ত কান্নার রেশ উঠল। 


ক্লাবের ছেলেরাই সব ব্যবস্থা করেছিল ইতোমধ্যে - খাটিয়া,ফুল,চাদর,বালিশ,ধূপকাঠি ইত্যাদি।সধবার মৃত্যু হয়েছে - তাই নিয়ম মাফিক গৃহ কর্তা  সিঁদুর আর আলতা পড়িয়ে অর্ধাঙ্গিনীকে শেষ বিদায় জানালেন।স্বর্গ রথে করে মহা সমারোহে মৃতদেহ চললো জলঙ্গীর ধারে শ্মশান ঘাটে।


এসবের মাঝে আর একটি মুখচোরা জীব ভিড়ের আড়ালে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল।সে এই তিন জনের পরিবারের শেষ সদস্য - ফণিবাবুর একমাত্র ছেলে সপ্তর্ষি।সপ্তর্ষি কল্যাণী ইউনিভার্সিটিতে রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।পড়া শোনার জন্য শেষ পাঁচ বছর সে কল্যাণীর হোস্টেলেই কাটিয়েছে।তবে মায়ের যাই যাই অবস্থায় গত দুই হপ্তা সে বাড়িতেই আছে।চোদ্দ দিনে সকলের অলক্ষ্যে অনেক কাঁদলেও এই শেষ বেলায় নিতান্তই পুরোষোচিত কঠোরতা তার চোখের জলের লাগাম কষে ধরলো।তার কিছু বন্ধু বান্ধব এসে জুটেছিল।তারাই তাকে নিয়ে শ্মশানের দিকে চলল।


শ্মশানে এসে মৃতের বাপ আর শ্বশুর বাড়ির লোকজনে সৎকার সম্বন্ধীয় নিয়ম কানন নিয়ে এক প্রস্থ বিতন্ডা হয়ে গেল।ফণি বাবু বাঙাল আর তাঁর স্ত্রীর বংশ ঘটি - তাই এই বিবাদ হওয়া আশ্চর্যের নয়।সেই বিবাদ মিটে দাহকার্য শেষ হতে প্রায় রাত একটা বাজলো।শ্মশান ভর্তি লোক একে একে বিদায় নিলো।শুধু সপ্তর্ষির মেজো পিসি আর তার মেয়ে সপ্তর্ষিদের বাড়িতে থেকে গেল - মৃতের পরিবারকে একা বাড়িতে রাত্রিবাস করতে নেই। 


পর দিন সকালে আবার আত্মীয় ও পরিচিত লোকজন ফল-মূল,মিষ্টি-দই নিয়ে হাজির হয়ে মহা কোলাহল শুরু করলো।কিন্তু বাড়িতে সদ্য ঘটা দুর্ঘটনার প্রতি আগত অথিতিবৃন্দের কোনো সমবেদনা প্রকাশ পেলো না।পুরুষ মানুষেরা নিজেদের পেশা,রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলো তো মেয়েরা সংসার ধর্ম নিয়ে খোশগল্প পাতলো।অথচ যিনি মারা গেছেন তিনি কয়েকদিন আগেও এদের খুব কাছের লোক ছিলেন।তবুও তাঁকে নিয়ে কোনো কথা বা তাঁর মৃত্যু নিয়ে কেউ বিন্দুমাত্র শোক প্রকাশ করলো না।


লাজুক হলেও সপ্তর্ষি ছিল সংবেদনশীল।কুটুম্বদের এরকম ব্যবহারে সে যেমন দুঃখ পেলো তেমনি বিরক্ত হলো।এক একবার ভাবলো - যাই ফিরে যাই নিজের হোস্টেলে।কিন্তু সকলে কি ভাববে এই বিবেচনা করে ক্ষান্ত হলো।সারাদিন নিজের কিছু বন্ধু আর ভাই বোনদের সাথে গল্প করে কাটালো।


ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে সপ্তর্ষি যে কটি খারাপ অভ্যাস ধরেছিলো সিগারেট ছিল তার মধ্যে একটি।কাল থেকে একটিও সিগারেট খেতে পারেনি সে। উপরন্তু বাড়ির এই শোরগোল থেকে কিছুক্ষন নিস্তার পেতেও সে অস্থির হয়ে উঠেছিল।তাই বাইরে বেরোবার অছিলা খুঁজতে লাগলো। 


সন্ধ্যের সময়, বাইরে একটু পায়চারি করতে যাবো বলায় বড় পিসি বললেন  - ''এই কদিন বাইরে যেতে নেই বাবা।"


জোরাজুরি করায় জানালেন  -"আচ্ছা যাও।তবে এ কদিন একলা বেড়োতে নেই,প্রতীমকে নিয়ে যাও। " 


প্রতীম মানে বড় পিসির ছেলে - সপ্তর্ষির থেকে বছর পাঁচেকের ছোট।


বেরোবার সময় বড়ো জ্যেঠিমা বললেন ,"যাচ্ছ যাও।কিন্তু অন্ধকারে যাবে না আর কখনো পিছনে তাকাবে না।"


পিছনে তাকাতে কিসের বারণ তা অবশ্য সপ্তর্ষি কিছুটা জানে।বছর দশেক আগে যখন তার ঠাকুরমা মারা যায় তখনো সে এই নিষেধ মেনেছে কিছুদিন। 


অগত্যা সপ্তর্ষি তার পিসতুতো ভাইকে নিয়েই বেরোলো।ভাই ধূমপান করতো না - অন্ততঃ বড়দের সামনে।তাই বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে একটা দোকান থেকে সিগারেট ধরিয়ে তারা দুজনে আরো কিছুটা তফাতে গিয়ে একটা জায়গায় দাঁড়ালো।জায়গাটা ফাঁকা আর পাশে ঝোপ ঝাড়ে ভরা - কিছু দূরেই নালার উপর একটা ভাঙ্গা পুল।বৈদ্যুতিক বাতি এদিকে নেই -তাই সন্ধের পর লোকচলাচল তেমন হয় না।গল্প করতে করতে সিগারেট খেতে মিনিট পাঁচেক লাগলো।


এরকম ভাবে আরো দু দিন চললো।প্রতিদিন এ সে বেড়াল তাকে ওই এক এ জায়গায় দেখতো।এমনকি একদিন তার ভাই কেও দেখালো।ঘরের বেড়াল ঝোপ ঝড়ে কি করে রাতের বেলায় - সপ্তর্ষির কৌতূহল হলো।এই কদিনে বেড়ালটার ওপর কেমন একটা টান জন্মে গেছে তার।  


এমন সুন্দর বেড়ালতো সপ্তর্ষি আগে কখনো পাড়ায় দেখেনি।সে নিজে বেড়াল খুব ভালোবাসে।বাড়িতে যখন থাকতো তখন নিজেই দুই তিনটে বেড়াল পুষেছিল।অবশ্য গত পাঁচ বছর সে ঘর ছাড়া - তাই পাড়ার বেড়ালদের খবর সে নাই জানতে পারে।এই ভেবে পরের দিন পাড়ার দুই চারটে ছেলেকে বেড়াল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো বটে কিন্তু তারা সবাই জানালো যে ওরকম বেড়াল এ তল্লাটে থাকা অসম্ভব।


পরের দিন প্রতীম আর এলো না তাদের বাড়িতে।সপ্তর্ষি বাধ্য হয়েই একাই বেরোলো। আবার দেখতে পেলো সে বেড়ালটাকে। আজ যেন তাকে একা দেখেই বেড়ালটা একটু এগিয়ে এসে একটা গাছের আড়ালে এসে দাঁড়ালো 


সেদিন রাতে সপ্তর্ষির ঘুম হলো না।বারবার সেই বেড়ালটার কথা তার মনে পড়লো। আহা কী সুন্দর - যেন সাক্ষাৎ লক্ষীর বাহন। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য,কোমলতা আর নির্মলতা যেন তার মধ্যে। সে যেন একটা শুভ শক্তি - যে গেরস্থের বাড়িতে যাবে সেখানেই লক্ষীর বাস হবে । তার 


এর পরেও সপ্তর্ষি  রোজ যেতে লাগলো সেই জায়গাটায় - সবার চোখ এড়িয়ে - একাই। আর রোজই সে দেখতে পেতো বেড়ালটাকে।খুব কাছে আসতো না যদিও।সপ্তর্ষিও ডাকেনি কোনোদিন। যেন কোনো অদৃশ্য বাধা তাদের আলাদা করে রাখতো। অথচ এই সান্নিধ্যের মধ্যেই এক অব্যক্ত তৃপ্তি খুঁজে পেতো সে - যেমনটি সে পেতো ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে মায়ের সাথে একান্তে খেতে বসে বা ছুটির নিঃসঙ্গ দুপুরে মায়ের পাশে শুয়ে শুয়ে। 


অবশেষে এগারো দিনের দিন শ্রাদ্ধ হলো।নিমন্ত্রিতরা সকলে এসে উমা দেবীর যথেচ্ছ সুনাম করে তার অকাল প্রয়াণের জন্য ফণিবাবু আর সপ্তর্ষিকে সান্ত্বনা দিয়ে গেলো।গীতাপাঠ করে ঠাকুর মশাই দক্ষিণা নিতে নিতে বললেন - "এমন ঠাকুর প্রতিমার মতো মা এত কম বয়সে চলে গেলেন সংসার ছেড়ে।গিরিধারীর লীলা কে বোঝে যাই হোক কোনোদিন সামর্থ্য হলে গয়ায় গিয়ে মায়ের নামে পিন্ড দিয়ে এসো।" বারংবার নিজের মায়ের প্রশংসা শুনে কখনো সপ্তর্ষির গর্ব হলো আবার কখনো চোখের কোণে জল এলো। 


এরপর সারাদিন অনেক আচার আচরণের পর শ্রাদ্ধ শেষ হলো।যার নাড়ী ছিড়ে ভূমিষ্ঠ হওয়া,তাকেই জীবন থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেবার আয়োজনের অবশেষে সমাপ্তি ঘটলো।শেষকালে নিয়মানুযায়ী একটা অন্ধকার ফাঁকা ঘরে কলার পেটোয় করে কিছুটা ছাই রেখে দেওয়া হলো। লোকশ্রুতি আছে যে, শ্রাদ্ধ শেষে আত্মা ধরাধামে তার নিজের আবাস ছেড়ে বৈকুন্ঠধামে যাত্রা করে - আর যাবার সময় তার পায়ের ছাপ পরে ওই ছাইয়ের উপর।এই আচারের সাথে অবশ্য সপ্তর্ষি পরিচিত। ছোটবেলায় ঠাকুরদা আর ঠাকুরমার শ্রাদ্ধে এই ব্যাপার সে দেখেছে - যদিও পায়ের ছাপ কোনদিন ছায়ের উপর পড়তে দেখেনি। 


সেদিন আর সপ্তর্ষি সিগারেট খাবার ফুরসৎ পেলো না।অনুষ্ঠান শেষ করে স্নান করতে করতেই সন্ধ্যে পার হলো।বেড়ালের প্রসঙ্গও তার মাথায় এলো না। 


সেদিনই রাতের কথা।সন্ধ্যে থেকে ঝির ঝিরে বৃষ্টি হয়ে বেশ ঠান্ডা পড়েছিল।ছোট শহর,তারপর আবার শীতের রাত - দশটার পর পাড়া পুরো শুনশান।দিন ভর খাটা খাটনির পর শ্ৰাদ্ধ বাড়ির লোকজন রাত ন'টা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।লোক বলতে সপ্তর্ষি,তার বাবা,মেজো পিসি আর তার মেয়ে।কাজ উপলক্ষ্যে যেসব আত্মীয় দূর থেকে এসেছিল তাদের বেশির ভাগই পাততাড়ি গুটিয়েছে।পরের দিন নিয়ম ভঙ্গ,তাই সকাল থেকেই আবার কাজের হিড়িক লেগে যাবে।সপ্তর্ষিরও সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছিল।তাই লেপ মুড়ি দিয়ে শুতেই দুই চোখ বুজে এলো।


ঘুম যখন ভাঙল তখন মাঝ রাত।গলাটা ভীষণ শুকিয়ে উঠেছিল সপ্তর্ষির।কিন্তু লেপটা চাড়া দিয়ে উঠতে গিয়ে পারলো না - এক অসীম আলস্য আর ব্যাথা তার দেহকে গ্রাস করেছে।শরীরটা ঠান্ডায় কাঁপছে।লেপটাকে কোনো রকমে আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে নিলো সে।বুঝতে পারলো জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে।ছোট বেলা থেকেই জ্বর জ্বালা তার নিত্যসঙ্গী - বিশেষতঃ ঠান্ডা আর জোলো আবহাওয়া একেবারে সহ্য হয় না তার।তাই এই দীর্ঘ এগারো দিন ধরে অনিয়ম আর গঙ্গা স্নানে যে শরীর খারাপ হবে তাতে আর আশ্চর্য কি?তবে মা থাকলে সারা রাত জেগে জল পটি দিত - মাথায় রসুন- তেল মালিশ করে গা-হাত-পা টিপে দিত।আজ নিজের জীবনে তাঁর গড়হাজিরায় সপ্তর্ষি প্রথম বারের জন্য নিজেকে অসহায় মনে করল।বাড়ির লোকজনকে ডাকার মতো শক্তি তখন দেহে ছিল না - লেপ ঢাকা দিয়ে নিশ্চল ঘুমহীন অবস্থায় পড়ে রইলো প্রায় ঘন্টা খানেক।


এক সময় হঠাৎই তার আধ খোলা চোখের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো খাট লাগোয়া জানলাটার দিকে।এতক্ষন ঘরটা পুরো অন্ধকার হয়ে ছিল।তবে এখন জানলা দিয়ে চাঁদের আলো উপচে পড়ছে বিছানার উপর।কখন যেন আকাশের মেঘ কেটে গেছে।বাইরের পাঁচিলটাও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।আর জানলার ফটকের উপর ঘট হয়ে বসে সেই সাদা বেড়ালটা সপ্তর্ষির দিকে স্থির চেয়ে আছে।যেন সে সবেমাত্র ঘর থেকে বেড়িয়ে বাইরে যাবার উপক্রম করছিলো-চোখাচোখি হওয়ায় দাঁড়িয়ে পড়েছে।ঘুম আর ব্যাথায় মলিন চোখে সপ্তর্ষি তাকিয়ে থাকল তার দুটি উজ্জ্বল চোখের দিকে - যেন বহু দিনের কোনো মায়ার টান আছে তার সেই মূক জীবটির প্রতি।যেন সে তার অতি পরিচিত আপনজন - যে আপনজন তাকে জীবনের এই দীর্ঘ একুশ বছর নিজের করে আগলে রেখেছিল।দুঃখ-কষ্ট,অসুখ-বিসুখ,ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি জুগিয়েছিল প্রতিনিয়ত।আজ সেই আপনজন শেষ বারের মতো এসেছে বিদায় জানাতে - আর বলতে যে এবার নিজের খেয়াল তাকে নিজেকেই রাখতে হবে। 


এভাবে কতক্ষন কাটলো ঠিক নেই।অতর্কিতে একটা হালকা হাওয়ার রেশ জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকলো।সে হাওয়া ঠান্ডা কী গরম ,জাগতিক কী  অতিপ্রাকৃতিক তার বিবরণ অপ্রয়োজনীয়।তবে সে বাতাস শরীরের সকল যাতনা নিমেষে শুষে নিতে পারে।যে পাখার বাতাসে সহস্র  শতাব্দী ধরে স্নেহময়ী মায়েরা তাঁদের সন্তানদের শিয়রে বসে অক্লান্ত শুশ্রূষা করে এসেছে - এ তেমনি প্রাণ জুড়োনো বাতাস।সপ্তর্ষি অনুভব করলো যেন এক অদৃশ্য কোমল হাত তার শরীর স্পর্শ করেছে  - খুব পরিচিত সে হাতের ছোঁয়া।অনেকটা আরাম বোধ হলো তার।জলের তেষ্টাও কখন উবে গেছে। বৈশাখের দুপুরে কলসীর ঠান্ডা জল যেমন সব তেষ্টা মিটিয়ে দেয় তেমনি তৃপ্তি তখন তার শরীরে।নিজের অজান্তেই তার চোখে ঘুম নেমে এলো।আর চোখ বুঝতে বুঝতে দেখলো সাদা বেড়ালটা যেন মিলিয়ে যাচ্ছে শার্সির ফাঁক দিয়ে। 


পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তখন অনেকটাই সুস্থ সপ্তর্ষি।রাতের কথা তার আবছা মনে ছিল।কিন্তু জানালার দিকে চেয়ে কিছু দেখতে পেলো না সে।লেপ থেকে বেরিয়ে শার্সির কাছে গিয়ে উঁকি মারলো।নাঃ,কোথাও তো সেই বেড়াল নেই।কিছুক্ষন সাত পাঁচ ভেবে জানলা থেকে মুখ ফেরাতে গিয়েই থমকে দাঁড়াতে হলো।জানলার ফটকে কিছু ধুলোর ছোপ দেখতে পেলো সে।রোজ তো কাজের লোক ঘর মোছামুছি করছে, তবে এতটা ধূলো আসে কি করে ?কাছে গিয়ে একটু ভালো করে দেখেই বুঝলো ওগুলো ছাই-এর দাগ - ছোট কোনো চতুস্পদ জন্তু ছাই মাখা পায়ে চলা ফেরা করলে যেমন দাগ পড়ে।




 

Monday, August 31, 2020

অণুগল্প : আসল শিক্ষা

বছর চারেকের অভিমন্যু পশুদের তথ্যচিত্র দেখছিল মনযোগ দিয়ে।বাঘ,হাতি,মাছ,কুমির আরও কত কি !কিন্তু তার সবচেয়ে ভালো লাগল এক ঝাঁক বুনো টিয়া পাখি - একেবারে তার পোষা পল্টুর মতো।এত টিয়া একসাথে দেখে সে অবাক।সবাই বন্ধু বান্ধব মিলে খেলা করছে - ঠিক যেমন সে করে থাকে স্কুলের বন্ধুদের সাথে।কিন্তু করোনার জন্য তিনমাস স্কুল বন্ধ - অভিমন্যুর তাই খুব মন খারাপ।তার চিন্তা হলো - তবে পল্টুরও কী মন খারাপ ?

দু'দিন পরেই বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস।অনলাইন ক্লাসে নিজের পছন্দের কোনো জন্তু নিয়ে বলার পালা।অভিমন্যু বলবে টিয়া পাখির কথা।ভেবেছিল পল্টুকে সে বন্ধুদের দেখাবে। কিন্তু সেটা আর হবে না।খাঁচাটা এখন ফাঁকা - তবে তাতে সে বেশ খুশিই।

Friday, August 28, 2020

অণুগল্প : হিপোক্রিট

ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার সত্যসাধন সামন্ত সকালে বাজার থেকে ফিরে ড্রয়িং রুমে উঁকি মেরে দেখলেন একমাত্র সুপুত্র PUBG খেলতে ব্যস্ত। কটাক্ষ করে বললেন - "বারো ক্লাসটা তো বেলেল্লাপনা করেই কাটালে। কলেজ খুললে অন্তত একটু পড়াশোনা করে উদ্ধার কোরো।" 'চিকেন ডিনার '-এ ব্যস্ত শ্রীমান বাবার নিতান্তই নিরামিষ উপদেশে পাত্তা দিলো না দেখে বিরক্তি ভরে একবার 'ধ্যাৎ' উচ্চারণ করলেন।

তারপর রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে গিন্নীকে বললেন - "ভাবছি পরের রবিবার সান্যালবাবু আর ওনার স্ত্রী কে দুপুরে খেতে নিমন্ত্রণ করবো।উনার হাত না থাকলে ওই নম্বর নিয়ে বাবুর physics honours কি হতো ! তাও আবার অমন নামজাদা কলেজে । কি বলো ? " গিন্নী হেঁসে সম্মতি জানালেন।

এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে সামন্ত বাবু মোবাইল ফোনে ফেসবুক প্রোফাইলটা খুললেন। কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করার পর ছেলের শেয়ার করা এবং অধুনা জনপ্রিয় হওয়া একটা পোস্ট নিজেও শেয়ার করে দিলেন - যাতে লেখা 'Nepotism Sucks' ইত্যাদি ইত্যাদি।

অণুগল্প : এ পারফেক্ট ক্লিক

মহানগরীর এক বিখ্যাত আর্ট গ্যালারিতে সৌম্যব্রত দস্তিদারের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী চলছিল।প্রায় শ'খানেক ছবি।তবে যেটা সবার নজর কেড়েছে সেটা সৌম্য বাবুরও পার্সোনাল ফেভারিট।তাঁর সব চেয়ে দামি লেন্সে তোলা আর অনেক কসরৎ করে এডিট করা একটা ক্যানভাস সাইজ ছবি - উল্লাস নগরীর কোনো ব্যস্ত রঙিন চৌমাথায় বেলুন বিক্রি করা একটা  সাদাকালো বুড়ো মানুষ - আর পাশে দাঁড়ানো বছর দশেকের সাদাকালো একটি মেয়ে।সবাই খুব তারিফ করলো।এক মার্কিন সংগ্রাহক তো লাখ টাকা দিয়ে বায়নাই করে ফেললেন।
দিনের শেষ।সৌম্যবাবু বন্ধুদের নিয়ে একটা ছোটো খাটো সাকসেস পার্টি রেখেছেন।তাই গ্যালারি বন্ধ হলে তিনি এক পাঁচ তারা হোটেলের পানশালায় এসে উঠলেন।
আর পরিত্তক্ত্য গ্যালারির ক্যানভাস ছেড়ে মেয়েটিকে সঙ্গ করে বেলুন-বুড়োও হাঁটা ধরলো - রঙিন শহরের বুক চিরে তার সাদাকালো অন্ধকার আস্তানার দিকে।

Saturday, July 18, 2020

পথ দেখালো বন্ধু

আমার স্কুল জীবন কেটেছে এক মফঃস্বলে।মুর্শিদাবাদের সদর থেকে মাইল বিশ দূরে গঙ্গার ধারে সেই অখ্যাত ছোট্ট শহর জিয়াগঞ্জ।বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক।তাঁর কর্মসূত্রেই জিয়াগঞ্জে বসবাস।সে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগেকার কথা।নব্বই-র খোকারা অধিকাংশই সেই সময় মায়ের কোলে আড়িমুড়ি কাটছে।টেলিফোন তখনো আমাদের শহরে পৌঁছয়নি।গুটি কতক বড়োলোক বাড়িতে সাদা কালো টেলিভিশন এসেছে সবে।রাস্তায় মার্কারি বাল্বের মিটমিটে আলো আর তার উপর ঘন ঘন লোড শেডিং।এক কথায় ছোট মফঃস্বলের দৈনন্দিন জীবন তখনো অনেক নিস্তরঙ্গ ও নিরুত্তাপ - মানুষে মানুষে দূরত্বও ঢের বেশি।

আমি তখন বারো ক্লাসে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ি।আমার অন্তরঙ্গ সঙ্গী - সুব্রত আর পরিতোষ।তাদের বসত জিয়াগঞ্জ থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরে এক গ্রামে।দশ ক্লাস পর্যন্ত তারা গ্রামের স্কুলেই পড়তো।তারপর সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় শহরের স্কুলে এসে ভর্তি হয়।আমার অবশ্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই একই স্কুল।স্কুল ভর্তি আটপৌরে ছাত্রদের ভিড়ে আমি ছিলাম ফার্স্ট বয়।তাই এগারো ক্লাসে যখন পাশের গ্রামের দুজন নামজাদা পড়ুয়া ছেলে এসে ভর্তি হলো আমার স্কুলে,তখন স্বাভাবিক ভাবেই তাদের সাথে বন্ধুত্ব জমতে দেরি হলো না ।তারপর আবার তিনজনেই একই কেমিস্ট্রি টিউশনে ভর্তি হলাম।শহরে কেমিস্ট্রির ভালো গৃহ শিক্ষক না থাকায় গঙ্গা পেরিয়ে আজিমগঞ্জ শহরে পড়তে যেতাম।বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক গঙ্গার ঘাট - তারপর নদী পেরিয়ে আধ কিলোমিটার গেলেই স্যারের বাড়ি।আমি যে রাস্তায় গঙ্গার ঘাটে যেতাম ,সুব্রত আর পরিতোষের ঘাটে পৌঁছাবার রাস্তা ছিল আলাদা - গঙ্গার পার বরাবর।আমরা প্রতি বুধ আর শুক্রবারে গঙ্গার ঘাটে জড়ো হয়ে বাকিটা রাস্তা একসাথে যেতাম।এগারো ক্লাসটা এভাবে ভালোই চললো বটে কিন্তু তিন মূর্তির বন্ধুত্বে গ্রহণ লাগলো বারো ক্লাসের গোড়াতেই - তার কারণ একটু বাদেই জানাচ্ছি।

যে দিনের কথা সেটা শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি ভেজা এক বুধবার।টানা তিনদিন ধরে মুষল ধারে নিম্নচাপের বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া।রাস্তাঘাট জল কাদায় থৈ থৈ।নদী কানাই কানাই ভর্তি হয়ে ছাপিয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে।স্বাভিকভাবেই স্কুলে যায়নি সেদিন।অবশ্য অমন দুর্যোগের মধ্যেও টিউশন না যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।তার কারণ অবশ্য কৈশোরের প্রথম প্রেম।মোবাইল ফোন,ফেসবুক বা অর্কুটের যুগ সেটা নয় - টিউশন,ফাঁকা ক্লাসরুম বা নির্জন গলিতে মুখো মুখি হয়েই তখন কপোত কপোতীদের প্রেম করতে হত।প্রণয়িণীর নাম উহ্য রাখছি। তবে এটা জানানো উচিত যে সে বারো ক্লাসের শুরুতেই টিউশন এ ভর্তি হয়। ভালো ছেলে হিসাবে তল্লাটে আমার বেশ নাম ডাক ছিল।তাই অচিরেই নবাগতা কুহকিনীর মন জয় করলাম।পরিতোষেরও যে মেয়েটির প্রতি দুর্বলতা ছিল সেটা বুঝেছিলাম। তবে সে মুখচোরা - সাধাসিধে গ্রাম্য ছেলে। প্রেম করা তার কম্ম নয়।কিন্তু একদিন যখন প্রেমিকার লেখা চিঠি আর উপহারের Rotomac পেনটা দুই বন্ধুর সামনে যুদ্ধজয়ী বীরের মতো বের করে বসলাম,সেদিন থেকেই আমার আর পরিতোষের স্বাভাবিক মেলামেশা আর কথাবার্তা বন্ধ হল। সুব্রত না থাকলে হয়ত মুখ দেখাদেখিই বন্ধ হয়ে যেত।

যাইহোক , সেদিনও ঝড় বাদলা মাথায় নিয়ে কারুর কথা না শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।ঘাটে এসে দেখি সুব্রত নেই - একা পরিতোষ দাঁড়িয়ে।জিজ্ঞাসা করায় সে বললো যে গ্রামের ক্লাব ফুটবলের ফাইনালে খেলবে বলে সুব্রত আসেনি।অতঃপর দুজনে ঘাট পার করে আধ ঘন্টা সাইকেল ঠেঙিয়ে সন্ধে সাতটায় যখন টিউশন পৌঁছলাম তখন আপাদমস্তক ভিজে গেছি।বলাই বাহুল্য যে এই দীর্ঘ পথে দু জনের মধ্যে আর কোনোই কথা হয়নি।

সেদিন স্যার  তিন ঘন্টার বদলে দুই ঘন্টা পড়িয়েই ছুটি দিলেন।সকলেই দূর দূরান্ত থেকে পড়তে আসে - অতঃএব এই দুর্যোগে বাড়ি ফেরা অসুবিধা।আমার অবশ্য তাতে ভালোই হলো।আমি বেরিয়ে পাশের নির্জন গলিতে প্রেমচারিতা শুরু করলাম।পরিতোষ দেখলাম সাইকেল নিয়ে বেরোবার সময় একবার অন্ধকার গলির মুখে দাঁড়ালো। হয়তো ভেবেছিল এই দুর্যোগের দিনে একসাথে যাবে।আমার অবশ্য সে সদিচ্ছা ছিল না।সুব্রত থাকলে তাও বা কথা ছিল। শুধুমাত্র বাদলার ভয়ে পরিতোষের সঙ্গ নিতে পৌরুষে বাঁধলো।সেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেল।সেদিনের প্রেম পর্বটা একটু বেশি সময় ধরেই চলল।ঘাটে যখন পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে দশটা - আবার বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে।

ঘাটে পৌঁছেই বুঝলাম যে রাত করে ভালো করিনি।এই কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতেই গঙ্গা যেন আরো ফুলে ফেঁপে উঠেছে।রাস্তা ঘাট এতটাই পিছল যে একটু অন্যমনস্ক হলেই সাইকেল নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়।ভাগ্য ভালো যে কোনো মতে শেষ নৌকাটা পেয়ে গেলাম - যাত্রী বলতে শুধুই আমি আর মাঝি।নৌকো যখন মাঝ গঙ্গায় তখন আরেক বিপত্তি।দুই পাড়েই এক সাথে লোড শেডিং হয়ে গেলো।চারিদিকে তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার - যেন আদিম পৃথিবীর কোনো এক ভরা গাঙে ভেসে চলেছি পৃথিবীর প্রাচীনতম দুই মানুষ - চরাচরে যাদের আর কোনো সঙ্গী নেই।গঙ্গার ঢেউয়ের ছলাৎ ছল আর পাড় ভাঙার হুড়মুড় শব্দে তখন বেশ ভয় করতে লেগেছে।ভরা গঙ্গা ঠেলে নৌকা যখন ঘাটে লাগলো তখন আমি ভিরমি খেলাম।আগেই বলেছি যে গঙ্গার ঘাট থেকে আমার বাড়ি প্রায় মাইল দুয়েক।এর মধ্যে প্রথম এক মাইল এরও বেশি রাস্তা শহরের চৌহুদ্দির বাইরে - খাল-বিল আর বন বাদাড়ের মধ্যে দিয়ে।এইটুকু রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ - খানা খন্দে ভরা।রাস্তার ধারে বড় বড় গাছ আর বাঁশ বন।লোকবসতি নেই কোনো।এই বাদলা রাতে সহযাত্রী পাবার আসা করাও ভুল।কারেন্ট থাকলে তাও মার্কারি ল্যাম্পের মিটমিটে আলোয় কোনোমতে আন্দাজ করা যায়।আজ চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।কিছুই ঠাহর করার জো নেই।ফেরি ঘাটের চড়াই টা উঠে আর যেন কিছুই চেনা যায় না - রাস্তাঘাট,খাল বিল সব যেন অন্ধকারে গ্রাস করেছে।এইবার আমার সুব্রত আর পরিতোষের কথা খুব করে মনে পড়ে গেলো।এর আগে অনেক বাদলা দিনেই আমাকে বাড়ি অব্দি পৌঁছে ঘুরপথে গ্রামে ফিরেছে তারা।আজ বোধহয় পরিতোষের সঙ্গ নিলেই ভালো করতাম !

নৌকটা ঘাট ছেড়ে চলে গেল।ঘাটের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে কি কর্তব্য ঠিক করছি এমন সময় যেন ইষ্ট দেবতা টর্চ মেরে পথ দেখালেন। বিশাল শব্দ করে বাজ পড়ার সাথে সাথে চারিদিক মুহূর্তের জন্য দিনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল।রাস্তার অবস্থানটা এক্স রে-র মনে ছেপে গিয়েছিল। দেরি না করে সেইদিকে সাইকেল ছুটিয়ে দিলাম।একে অন্ধকার তারপর চশমা তে জল পড়ে আরেক বিপত্তি।বিদ্যুতের আলোতে পথ ঠাহর করে এগোতে লাগলাম কোনোক্রমে।দমকা হাওয়ায় গায়ে বৃষ্টির ঠান্ডা জল বিঁধছে বরফের মত।।শহরের অনেক লোকের কাছেই এই রাস্তায় ভুতুড়ে কান্ড নিয়ে কানাঘুসো শুনেছি - অদ্ভুতদর্শন  বেড়াল কুকুর ঘুরে বেড়ায় অমাবস্যা রাত্রে।এই কুক্ষনে সেই সব আজগুবি কথা মনে পড়তে লাগলো বেশি করে।চারিদিকে ব্যাঙ,ঝিঁঝিঁ পোকা আর শেয়ালের শব্দে গা ছমছম করছে।মিনিট পনেরো সাইকেল চালিয়েছি বটে তবে পথ বেশিদূর আসতে পারিনি। রাস্তার খানা খন্দে সাইকেলের চাকা হোঁচট খাচ্ছে।এই পড়ি সেই পড়ি অবস্থা।পড়তে দেরিও লাগলো না।দেখতে না পেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লাম।চশমাটা ছিটকে গিয়ে পড়ল পাশের জঙ্গলে।ওটা ছাড়া আমি আবার কানা।তার উপর হাত পায়ে তীব্র ব্যাথা - ঢোক গিলে বুঝলাম মুখটা ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে।এক অজানা ভয়ে শরীর তখন অবশ হয়ে আসছে।যেন বেরোবার কোনো উপায় নেই এই সর্বব্যাপী অন্ধকার ভেদ করে।বেশ কিছু সময় কেটে গেল মাটিতে পড়ে থেকে।আন্দাজে মিনিট পনেরো কুড়ি হবে - তবে তখন সেটাই কয়েক হাজার বছরের সমান।

নিজেকে প্রায় ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছি , এমন সময় হঠাৎ মনে হলো সাইকেলের বেলের আওয়াজ পেলাম ।অস্ফুট একটা শব্দ - কিড়িং কিড়িং । তারপর যেন কেউ খাটো গলায় বলল - 'ওঠ ভাই।ভয় নেই।'।আওয়াজটা তো চেনা লাগে বেশ - হ্যাঁ,পরিতোষেরই তো গলা।কিন্তু ও এখনো এখানে কি করছে ? বেশি ভাবার সময় তখন ছিল না যদিও ।এই নরক থেকে বেরোবার এটাই যেন শেষ উপায়।অন্ধকার হাতড়ে সাইকেলটা তুলে নিয়ে সেই অজ্ঞাত সাইকেল চালকের পিছু নিলাম।চশমা নেই তাই সবকিছু আবছা দেখছি।তবে শরীরের কাঠামো আর হেলদোলে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে আর সন্দেহ নেই যে এ পরিতোষই বটে।কিন্তু কি অদ্ভুত তার সাইকেলের চাল।এই মনে হচ্ছে তাকে ধরে ফেলব-অথচ পর মুহূর্তেই যেন ছবির মতো দূরে চলে যাচ্ছে।ডাকবার মতো আওয়াজ তখন গলা দিয়ে বেরোচ্ছিল না।আমি প্রায় মন্ত্রমুদ্ধের মতো তার পিছু পিছু চললাম।প্রায় পনেরো মিনিট এভাবেই চলল।শহরের দোর গোড়ায় এসে তাকে আর দেখতে পেলাম না।কপ্পুরের মতো যেন উবে গেলো কোথায় ?ব্যাপারটা অদ্ভূত লাগলো একটু। কিছুক্ষন দাঁড়িয়েও তার কোনো পাত্তা পেলাম না।ভাবলাম রাত হয়েছে তাই তাড়াতাড়ি সাইকেল ছুটিয়েছে - এখান থেকে ঘুরপথে ওর বাড়ি অনেকদূর।আমিও হন্তদন্ত সাইকেল চালিয়ে শহরের অন্ধকার ভেদ করে বাড়িতে ঢুকলাম।বাড়ি শুদ্ধ লোক যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো।বকাবকি অবশ্য ভালোই জুটেছিল কপালে।বিছানায় শুয়ে শুয়ে একবার সাধা সিধে গ্রাম্য পরিতোষের মুখটা মনে পড়ল - ঠিক করলাম পরের দিনই দেখা করে ভালো করে কথা বলবো।

সংবাদ তখনো ছড়াতো মানুষের মুখে মুখে।তাই অবাক করা খবরটা পেলাম পরের দিন সকালে ফিজিক্স টিউশনে গিয়ে তবেই - পরিতোষ নাকি গতকাল থেকে নিখোঁজ।কেমিস্ট্রি পড়ে আর বাড়িই ফেরেনি সে।আকাশ থেকে পড়লাম।সঙ্গে সঙ্গে দৌড়লাম ওদের গ্রামের দিকে।বাড়ি চিনতাম না-তবে রাস্তাতেই সুব্রত কে দেখলাম।উদ্ভ্রান্ত হয়ে শহরের দিকেই আসছিল।সব কথা বললাম ওকে।তারপর ওর সাথেই ছুটলাম পরিতোষ কে খুঁজতে।

পরিতোষকে পাওয়া গেলো সেদিন সন্ধে নাগাদ - গঙ্গার ধার বরাবর যে রাস্তায় সে যাতায়াত করত তারই ধারে এক নালায় ওর লাশটা ভেসে উঠেছিল।ফুলে ফেঁপে ঢোল হওয়া বিকৃত একটা মৃতদেহ।আমি অবশ্য সেটা নিজের চোখে দেখার সাহস করতে পারিনি।বন্ধুর সাথে শেষ বারের মত কথা বলতে পারলাম না - অস্ফূটেই চোখের জল ফেললাম।কাল হয়তো একসাথে ফিরলে আজ ছেলেটা বেঁচে থাকত - এখনো আমার সেজন্য নিজেকে দোষী মনে হয়।

লোক মুখে শোনা গেল যে আগের দিন সন্ধে থেকেই নাকি গঙ্গার ধারের বাঁধ ভেঙে নালা ছাপিয়ে রাস্তা দিয়ে খরস্রোত বইছিল।সবাই অনুমান করল যে ওই স্রোতেই দেখতে না পেয়ে বেচারা তলিয়ে গেছে রাত বিরেতে।তাই যদি হয় - তবে সে তো কাল শহরের রাস্তায় আসেইনি।তাহলে আমাকে কাল অভয় দিয়ে পথ দেখিয়েছিল কে ?

Tuesday, June 16, 2020

Remembering Irfan in My Way




Amid the public outpour of respect and condolences over Irfan Khan's death , there is a striking aspect to ponder on - how do countless Indians despite their religious and cultural differences mourned and paid tribute to an actor belonging to a minority community.Definitely there could not be a more deserving person than this man who embraced Indianism in its truest sense.He played 'Pan Singh Tomar' and 'Sajan Fernandez' with the same grit and dedication as 'Maqbool' and 'Roohdar' - giving expression to the untold dreams and emotions of the rank and file.And in return we have loved, lived and celebrated each of these characters in equal measures - never questioning whether the real man behind them eats beef or chants 'Bande Mataram'.

In these testing times, when our cultural and religious tolerance and pluralism are under constant threat,people like him and our act of love and respect towards them give another occasion to celebrate the diversity and cultural richness of our nation.Of course we need many more like him to keep the tradition going.

Long live the legacy of this great showman.

Rest in peace Irfan Khan.


Saturday, June 13, 2020

What's Not In A WFH


I have been serving food to some stray dogs in my locality since past few months. They follow me on roads wagging their tails ecstatically whenever I approach outside. First I thought that this bonhomie is a result of their longing for food. However, it was not long before I realised that this behaviour has nothing to do with me serving food to them - they behave the same way even when they have no appetite. So I thought harder for an explanation and got the same in a lesson I learnt in History books .Dogs have always enjoyed company of humans - a trait that made them arguably the first animals to be befriended and domesticated by our forefathers and something that the dogs of my vicinity have inherited from their ancestors.

I am telling all these to remind us of a similarity between dogs and human beings - we both are social animals. We love to live in company of others and feel restless in isolation.For people in white collar jobs, the workplace and colleagues make a big part of this social sphere.The lunch time gossips we make, the tea time jokes we share and the mere feeling of being surrounded by people close to our heart help to weave the social fabric that keeps us attached to each other and nurture our emotions.The ongoing social distancing and Work From Home (WFH) arrangement have forced us to remain confined to home. While tweeting with a picture perfect click of our home-workstation adorned with accessories and the customary coffee mug may be a temporary source of joy , this exile from our circle of friends and acquaintances will invariably take toll on our mental well being.

The norms of social distancing will hopefully be lifted someday as we tame this catastrophic pandemic but experts believe that the idea of WFH is here to prevail and gain currency. Already some of the IT behemoths have announced that the WFH model may well be the 'new normal' for their employees in foreseeable future. However, any concept of workplace which is entirely devoid of regular contact between the humans involved is highly unlikely going to be a sustainable solution. The companies may prosper economically adding a few extra bucks to our wallet at the end of the month but this monetary gain will come at serious cost to our social character traits and mental well-being - at least till the day our cerebrum controls our emotions.